আইজ্যাক নিউটন
আইজ্যাক নিউটন

বন্ধুরা আশা করি সবাই ভালো আছ। আমরা আইজ্যাক নিউটনের নাম নিশ্চয়ই জানি। ধারনা করা হয়, সে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন বিজ্ঞানী। তার আবিষ্কৃত গতির তিনটি সূত্র মানুষদের চাঁদ-এ তো নিয়ে গেছে এখন মঙ্গল গ্রহেও নিয়ে যাবে। আর তার আবিষ্কৃত গণিতের শাখা ক্যালকুলাস তো তাকে অমর করে রেখেছে। নিউটনকে আমরা সবাই তাই মহান একজন মানুষ বলে জানি। কিন্তু সে কি আসলেই মহান?

বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার বিখ্যাত গ্রন্থ “আ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম” গ্রন্থের পরিশিষ্টে নিউটনের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী সংযুক্ত করেছেন। সেখানে তিনি নিউটনের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয় প্রকাশিত করেছেন। সে সকল বিষয় নিউটনকে আর মহান হিসেবে প্রকাশ করে না।

বিজ্ঞানী নিউটনের প্রিন্সিপিয়া বই প্রকাশিত হওয়ার পর সে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি রয়েল সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নাইট উপাধি লাভ করেন। এর পরপরই নিউটনের সাথে দুইজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী যারা তার প্রিন্সিপিয়া বই লিখার সময় তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে। এরা হলেন রয়েল এবং ফ্ল্যামস্টিড। সংঘর্ষের কারণ, নিউটন তাদের কাছ থেকে এমন কিছু তথ্য চেয়েছিলেন যা তারা দিতে সম্মত হননি। নিউটন কোন না সহ্য করতে পারতেন না। তিনি নিজেকে রয়েল মানমন্দিরের পরিচালনা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করে তার চাওয়া সেই তথ্য-উপাত্তগুলোর অবিলম্বে প্রকাশের দাবী করেন। কিন্তু তিনি উপাত্তগুলো পাননি। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ফ্ল্যামস্টিডের গবেষণাকর্ম তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে এডমন্ড হ্যালির নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। অথচ হ্যালি ছিলেন ফ্ল্যামস্টিডের আজীবন শত্রু। সুবিচারের আশায় ফ্ল্যামস্টিড আদালতের আশ্রয় নেন এবং বিচারের পর তার কাছ থেকে চুরি করে নেয়া গবেষণাকর্মের প্রকাশনা বণ্টনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিউটন তার লেখা প্রিন্সিপিয়া বইয়ের পরবর্তী সংস্করণসমূহে ফ্ল্যামস্টিডের নামে উল্লেখিত সকল তথ্যসূত্র কেটে বাদ দিয়ে দেন। (6)

নিউটনের সাথে আরেকটি বড় ধরণের বিরোধ ছিল জার্মান দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ গটফ্রিড লাইবনিজের সাথে। লাইবনিজ এবং নিউটন সম্পূর্ণ

গটফ্রিড লাইবনিজ
গটফ্রিড লাইবনিজ

স্বাধীনভাবে প্রায় একই সময়ে বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার উন্নয়ন ঘটান যা ক্যালকুলাস নামে পরিচিত। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে এই শাখাটি। যদিও আমরা এখন জানি নিউটন লাইবনিজের কয়েক বছর পূর্বেই এটি আবিষ্কার করেছিলেন, তবে তিনি তা প্রকাশ করেছিলেন অনেক পরে অর্থাৎ ১৬৯৩ সালে আর পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে। আর লাইবনিজ তার কাজের একটি পূর্ণ বিবরণ ১৬৮৪ সালেই প্রকাশ করেছিলেন। মূলত লাইবনিজের ব্যবকলন পদ্ধতিই পরবর্তীতে মহাদেশ জুড়ে গৃহীত হয়েছিল। কে আগে এটি আবিষ্কার করেছেন তা নিয়ে তৎকালীন বিজ্ঞানী সমাজের মাঝে প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। দুজনের বিরুদ্ধে ও পক্ষেই অনেক লেখালেখি হয়। আশ্চর্যের বিষয়, নিউটনের পক্ষে লিখিত অধিকাংশ নিবন্ধই ছিল তার নিজের লেখা এবং তার বন্ধুদের নামে প্রকাশিত। বাগ্‌বিতণ্ডা চলতে থাকায় লাইবনিজ বিষয়টি রয়েল সোসাইটিতে উত্থাপন করেন। সোসাইটির সভাপতি ছিলেন নিউটন। তিনিই এর সঠিকতা অনুসন্ধানের জন্য তার বন্ধুদের নিয়ে একটি পক্ষপাতিত্বমূলক কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ শুরু করে ১৭১১সনে। রয়েল সোসাইটির প্রতিবেদনে লাইবনিজকে গবেষণা কর্ম চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর নিউটন নিজের নাম গোপন করে এক সাময়িকীতে রয়েল সোসাইটির প্রতিবেদনের পক্ষেও লিখেছিলেন। লাইবনিজের মৃত্যুর পর নিউটন বলেছিলেন,“লাইবনিজের মন ভেঙ্গে দিয়ে আমি খুব শান্তি পেয়েছেন”  (6)

লাইবনিজের সাথে যখন তার বিরোধ চলছিল তখনই নিউটন কেমব্রিজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের জগৎ ছেড়ে তিনি ক্যাথলিক-বিরোধী রাজনীতি ও পরবর্তীতে সংসদীয় কাজে যোগ দেন। একসময় রয়েল মিন্টের ওয়ার্ডেনের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। সেখান থেকে তিনি জাল-বিরোধী কর্মকাণ্ডকে জোরদাড় করে তুলেন। এর কারণে অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছিল বলে স্টিফেন হকিং তার বইয়ে লিখেছেন।

এই যদি হয় আমাদের মহান বিজ্ঞানী নিউটনের অবস্থা তাহলে তাকে কতটুকু মহান বলা চলে।