কম্পিউটারে রূপকথার দক্ষতা এখন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালের ১৯ জুন প্রথম রূপকথার কম্পিউটার চালানোর আশ্চর্য দক্ষতা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয় প্রথম আলোয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। এখন কম্পিউটারে রূপকথার দক্ষতা আরও বেড়েছে। তাকে নিয়ে কমিক স্ট্রিপ করেছে রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট। রূপকথার সাম্প্রতিক খবর নিয়ে এই প্রতিবেদন

রুপকথার কাহিনী এখন পাঠ্য বইয়ে!

চোখ মনিটরের দিকে। এক হাত মাউসের ওপর, আরেক হাত কিবোর্ডে। দ্রুতগতিতে চলছে ফাইল ট্রান্সফার আর ইনস্টলের কাজ। মনোযোগ কম্পিউটারের বড় পর্দায় চলতে থাকা ইউটিউবের টিউটোরিয়াল ভিডিওর দিকে। ভিডিওতে যা যা দেখানো হচ্ছে, সেটিই করা হচ্ছে ভার্চুয়াল ওয়ার্কস্টেশনে। এমন কাজ দেখা গেল বাংলাদেশের ছয় বছর বয়সী রূপকথার বাসায় গিয়ে। পুরো নাম ওয়াসিক ফারহান। আগের দিন ২৭ জানুয়ারি ছিল তার জন্মদিন। গায়ে ‘হ্যাপি বার্থডে অ্যাংরি বার্ড রূপকথা’ টি-শার্ট পরে কাজ করছিল সে।

রূপকথার এমন সাফল্যের কথা যুক্ত হয়েছে জাতীয় টেক্সটবুক বোর্ড প্রকাশিত চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ে। অষ্টম শ্রেণীর ইংরেজি বইয়ের ৮৭ পৃষ্ঠায় অষ্টম অধ্যায়ে ‘নিউজ! নিউজ! নিউজ!’-এ রূপকথার একটি স্কেচসহ বিশেষ সংবাদ দেওয়া হয়েছে। কম্পিউটার-পারদর্শী হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম উঠিয়েছে এমন শিরোনামের লেখাটিতে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘৬ বছর বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ রূপকথা। সে আশাবাদী, তার এ সাফল্যের কথা মাইসফট এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পাবে। ছোটবেলা থেকেই ভিডিও গেমসে পারদর্শী রূপকথা সে সময়েই মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে লিখতে পারত।’ এ সংবাদের পাশাপাশি রূপকথার মা সিনথিয়া ফারহানের একটি বক্তব্যও রয়েছে।
একই শ্রেণীর গার্হস্থ্যবিজ্ঞান বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৫৭ পৃষ্ঠায় রূপকথার দুটি ছবি ছাপা হয়েছে, যার একটির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে ‘বাংলাদেশি চার বছরের প্রতিভাবান শিশু-রূপকথা’ এবং অন্যটিতে লেখা রয়েছে ‘সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ কম্পিউটার প্রোগ্রামার।’ নিজের কথা পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হওয়ায় বেশ খুশি রূপকথা। সিনথিয়া ফারহিন জানালেন, ‘এ খবর আসলেই আমাদের জন্য বেশ আনন্দের। রূপকথার এ খবর এখন শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেও জানতে পারবে।’ বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরেছে রূপকথার এ সাফল্য। আর সেটিই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে। অনেক ভালো লাগছে বলে জানালেন রূপকথার বাবা ওয়াসিম ফারহান।

বিস্ময়কর বিভিন্ন ঘটনা সংরক্ষণ ও প্রকাশের জন্য বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান রিপলি’স বিলিভ ইট অর নটের কমিকে স্থান পেয়েছে রূপকথা। বিলিভ ইট অর নট সারা বিশ্বের বিভিন্ন আশ্চর্যজনক ঘটনার স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। গত বছরের ২৫ নভেম্বর রিপলিস কার্টুন সিরিজে প্রকাশিত হয়ে রূপকথার কার্টুন। ‘ওয়ান্ডার বয়’ শিরোনামে প্রকাশিত কার্টুনটিতে দেখানো হয়েছে ল্যাপটপে কাজ করছে রূপকথা, আর লেখা রয়েছে ‘বাংলাদেশের ওয়াসিক ফারহান-রূপকথা। মাত্র ছয় বছর বয়সে যে কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রোগ্রাম করতে পারে!’ রিপলিসের পরবর্তী বইয়েও যুক্ত হচ্ছে এটি।

রূপকথার মা সিনথিয়া ফারহান ও বাবা ওয়াসিম ফারহান দুজনেই জানালেন, সারা দিনই রূপকথার সঙ্গী হলো কম্পিউটার।যখন তার বাসায় যাওয়া হলো তখন ভিএমওয়্যার ওয়ার্কস্টেশন ব্যবহার করে মাইক্রোসফট উইন্ডোজের বিভিন্ন সংস্করণ পরীক্ষা করছিল রূপকথা। এ ওয়ার্কস্টেশন ব্যবহার করে একই কম্পিউটারে একাধিক অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করে সেটিও ব্যবহার করা যায়। নিজের কম্পিউটারে উইন্ডোজ ৮ হোম প্রিমিয়াম সংস্করণ ব্যবহার করা রূপকথা ভিএমওয়্যার দিয়ে উইন্ডোজ এক্সপি, উইন্ডোজ ৯৮ অপারেটিং সিস্টেমগুলো ব্যবহার করছে আর এর নানা ধরনের বৈশিষ্ট্য এবং বর্তমান সংস্করণের সঙ্গে কী কী পার্থক্য, তা বের করছে!
মাত্র তিন বছর বয়সেই কম্পিউটারের নানা কাজে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে রূপকথা। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে আরও নানা বিষয়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে থাকে সে। ওই সময়েই সে কোনো ধরনের সহযোগিতা ছাড়াই কম্পিউটারে কঠিন সব গেমস খেলার পাশাপাশি মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে লিখতে পারত। তবে এখন ধীরে ধীরে যেন রূপকথার পরিপক্বতা বাড়ছে। এখন আর সে ভিডিও গেমস খেলা নিয়ে ব্যস্ত নয়। ভিএমওয়্যারে যখন মাইক্রোসফটের বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে গবেষণা করছে রূপকথা, তখনই হঠাৎ ইউটিউবের ভিডিও দেখতে সমস্যা হচ্ছিল। ইউটিউব ভিডিওর এমন অবস্থা থেকে বিরক্ত সে। তারপর বলে উঠল চলতি বছরেই আসবে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ২০১৩ সংস্করণ এবং এ সংস্করণটি সে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স সাইট আমাজন থেকে কিনবে! কিছু জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করতেই থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলতে থাকল, উইন্ডোজের কোন অপারেটিং সিস্টেমের কী কী বৈশিষ্ট্য আর কী কী সমস্যা! হঠাৎ মনে উঠল গুগলের স্লোগানের কথা। একসঙ্গে তাই নিজেই বলে গেল এইচপি, অ্যাপলের স্লোগান! কাজের পাশাপাশি প্রযুক্তি দুনিয়ার বিভিন্ন খবরও এখন রাখে রূপকথা। আরও অবাক হওয়ার পালা এল যখন সে বলতে লাগল, জনপ্রিয় মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্সের ডিস্ট্রো উবুন্টু তৈরি প্রতিষ্ঠান ক্যানোনিক্যাল বেশ ভালো কাজ করছে। উবুন্টুটা ভালো। আরেক ডিস্ট্রো ফেডোরা যদিও একটু কঠিন, তবে বৈশিষ্ট্যগুলো মোটামুটি ভালো! এখনো রূপকথার দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটে কম্পিউটারের সঙ্গে। ঘুম থেকে উঠেই কম্পিউটার খোলে। তারপর নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে থাকে সে।