আমি মনে হয় একজন ভালো ছেলে।”ভালো ছেলের” সংজ্ঞা আমি জানি না।নিজের প্রশংসা আমি করছি না।যে সব কাজ করতে গেলে আমার বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না, তা থেকে আমি ১০০ হাত দূরে থাকি।কখনও গার্লস স্কুলের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকিনি।ছোটদের সাথে দাদাগিরি দেখাতে যাই নি।  শুধু একটা খারাপ অভ্যাস ছিল।গল্পের বই পড়া।পড়ার বইয়ের মাঝে গল্পের বই পড়তাম।অবশ্য এর ফলাফলও পেয়েছি।কিছু Subject-এ A- পেয়েছি।আসলে আমি ভালো ছেলে হলেও ভালো ছাত্র নই।পাঠ্য বইয়ের চেয়ে গল্পের বইয়ের প্রতি আমার বেশি আকর্ষণ।বলতে গেলে Grading System-এ আমি A/A- প্রাপ্ত ছাত্র।

এত গেল,আমার কথা।এবার আমার এক বন্ধুর কথা বলি।ক্লাসে সবসময় সে মনযোগ দিয়ে স্যারদের লেকচার শুনে।H.W. সবসময় নিয়ে আসে।কিন্তু আফসোস, সে পরীক্ষার সময় কেন জানি সব উত্তর লিখতে পারত না।অবশ্য যা লিখত সম্পূর্ণ নিজের মেধা দিয়েই লিখত।কারো খাতায় উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে লেখার অভ্যাস তার কখনোই দেখিনি।

আবার,আমার আরেক ক্লাসমেট সারা বছর মেয়েদের পিছনে ঘুরেছে।স্কুল ফাঁকি দিত।পড়ালেখার সাথে তার কোনো সম্পর্কই ছিলো না।পরীক্ষার সময় ছোট ছোট পেজে নকল নিয়ে সুদক্ষ ভাবে সে তার কার্যসিদ্ধি করতে ওস্তাদ ছিল।এর থেকেও বড় কথা,সে স্যারদের নিয়ে আজে-বাজে কমেন্ট করে।

যাই হোক দেখতে দেখতে S.S.C. পরীক্ষার সময় এসে গেল।পরীক্ষা দিলাম।রেজাল্টও বের হল।আমি পেলাম 4.88(A) আমার সেই পড়ুয়া বন্ধু পেল 4.94(A) আর সেই ক্লাসমেট পেল 5.00(A+) ।তার এই পাওয়াতে আমরা কেউ বিন্দু মাত্র অবাক হইনি।কারণ নিজের চোখেই দেখতাম সে শার্টের ভিতরে + অন্যান্য জায়গায়(জায়গায় নাম আর উল্লেখ্য করলাম না,আশা করি পাঠক বুঝে নিতে পারবেন) সুন্দরভাবে পেজের ভান্ডার নিয়ে যেত।

এত কথা বলার মূল কথাটা কি জানেন?এবার বলছি।আমার পাশের বাসার এক ভাইয়ার সাথে সেদিন আমার বাবার দেখা হলে,ভাইয়া আমার রেজাল্ট জানতে চায়।বাবার কাছ থেকে রেজাল্ট শুনে সে আমার রেজাল্টের প্রতি কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে চলে গেল।কিছুদিন পর ছাদে বসে গল্পের বই পড়ছি,হঠ্যাৎ সেই ভাইয়া এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল-

ভাইয়াঃ কিরে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া হচ্ছে?এমনিতেই তো খারাপ রেজাল্ট করেছিস।

আমিঃ লুকিয়ে না তো। মাকে বলেই ছাদে এসেছি।এসে বই পড়ার ইচ্ছে হল তাই পড়তে বসলাম।

ভাইয়াঃইসস,কি আমার পড়ুয়া রে,স্কুল ফাঁকি দিয়ে কয়টা মেয়ের পিছনে যে লাইন দিতি তা কি আর আমি বুঝি না?শুনলাম তুই  নাকি এই বয়সেই সিগারেট ধরে ফেলেছিস? 😎

আমিঃ কি??? স্কুল ফাকি,সিগারেট? এসব কি বলছ তুমি?আমি ক্লাসে ১০০% উপস্থিতির জন্য পুরুস্কারও পেয়েছি।আর সিগারেট খাওয়া তো দূরের কথা,গন্ধটাই সহ্য হয় না। 😯

ভাইয়াঃ আমার সাধু বাবা রে! তাহলে রেজাল্ট এরকম হল কেন?তোর মত রেজাল্ট করা ছেলেদের কাজকর্ম আমার হাড়ে-হাড়ে জানা।এলাকার দাদাগিরি দেখানোই তোদের কাজ।আবার বলস ১০০% উপস্থিতি?ইসশ,রোল কলের খাতায় কয়বার দুই নম্বারি করসোস রে? (666)

আমি হতভম্ব! কিছু না বলে মুখ নিচু করে থাকি।

তখন ভাইয়া হাসতে হাসতে চলে গেল।এর মাস খানেকের মধ্যে সবাই আমার সম্পর্কে এই ধারণা করল যে, আমি খারাপ ছেলে।স্কুল লাইফে স্কুল ফাঁকি দিয়ে মেয়েদের পিছনে টাইম নষ্ট করতাম।
আহ, রেজাল্টের কি কদর! এই রেজাল্ট দিয়েই আমাদের সমাজে খারাপ-ভালোর পার্থক্য হয় তা যদি আগে জানতাম,তাহলে……।

একটা সার্টিফিকেটেই ভালো-মন্দের বিচার হয় না। A+ না পেলেও অনেক ছাত্রই আছে যারা অন্যায়ের সাথে আপোস করে না। আমরা রাশেদের(“আমার বন্ধু রাশেদ” গল্পের চরিত্র)মত ছেলেদেরকে নিয়ে গর্ববোধ করতে চাই।বড় বড় সার্টিফিকেট থাকলেই সে ভালোই হবে এমন কোনো কথা নেই।আমাদের সমাজে আজও সকলের মাঝে এই ধারণা যে ভালো রেজাল্ট মানেই সে খাঁটি সোনা।হায় সৃষ্টিকর্তার সেরা জীব হয়েও কেন আমরা নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে বিচার করি না?

সকলের কাছে আমার অনুরোধ কোনো A-/B পাওয়া ছাত্র দেখলেই যে তাকে খারাপ মনে করবেন এই ধারণা থেকে সরে আসুন।

[বিঃদ্রঃ উল্লেখিত কাহিনী কাল্পনিক।কারও সাথে কাহিনীর কোনো সম্পর্ক থাকলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও ব্লগার কোনরূপেই দায়ী নয়]