‘হ্যাঁলো, কে জুঁই?
হ্যাঁ।
জুই, তুমি “এ” গ্রেড পেয়েছো।
কী?
সত্যি!
ও মা, মা… আমি “এ” গ্রেড পাইছি। হুর রে রে….আপনি আমাদের বাসায় আসেন। পরে কথা বলব।’ বলেই মুঠোফোনটি রেখে দিলেন স্বামীর অমতে লেখাপড়া করার অপরাধে আঙুল কেটে নেওয়ার শিকার হাওয়া আক্তার ওরফে জুঁই।

আজ বুধবার দুপুরে প্রথম আলোর প্রতিবেদক মুঠোফোনে জুঁইয়ের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল জানাতেই এমন সব কথা অপর পাশ থেকে ভেসে এল।
নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন জুঁই। কিন্তু আঙুলবিহীন হাতে লেখার গতি কম হওয়ায় সাহায্যকারী শ্রুতি লেখক খালাতো বোন সানিয়া সুলতানা পরীক্ষা দিয়েছে। স্বামীর অমতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অপরাধে হাতের আঙুল কেটে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। কিন্তু এতে দমে যাননি জুঁই, সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ‘এ’ গ্রেড (জিপিএ-৪.৩০) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
হাওয়া আক্তার ওরফে জুঁই প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেজাল্ট নিয়ে অনেক ভীতি ছিল। কারণ, আমি নিজে লিখে পরীক্ষা দিতে পারি নাই। তবে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি যে তিনি আমাকে ভালোভাবে পরীক্ষায় পাস করিয়েছেন। তবে মনে হচ্ছে, আমি নিজের হাতে লিখতে পারলে হয়তো জিপিএ-৫ পাইতাম। আমি সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকব আমার খালাতো বোন সানিয়ার কাছে। কারণ, তার সহযোগিতায় আমি পরীক্ষা দিতে পেরেছি।’

পরীক্ষার হলে বোন লিখে দিচ্ছে।

জুঁই আরও বলেন, ‘আমার আঙুল কেটে ফেলার পর মনে হয়েছিল যে আমি পরীক্ষাই দিতে পারব না। পরে কলেজের স্যার ও মা-বাবার উত্সাহে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে “এ” গ্রেড নিয়ে পাস করেছি। তবে এখন আমি একটা কথা বলতে পারি, কোনো কাজের আগে ইচ্ছাশক্তিটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। এর বড় প্রমাণ আমি নিজে। আমার দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণে আজকে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাস থাকলে আমার মতোন জুঁইদের জয় হবেই হবে। পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
সানিয়া সুলতানা বলে, ‘জুঁই আপুর পরীক্ষা আমার হাত দিয়ে লিখেছি। আপুর যুদ্ধের সহযোদ্ধা আমি নিজেও।’
নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘হাওয়ার পরীক্ষা দেওয়া, ভালো রেজাল্ট করা, সব কিছুই ছিল স্বপ্নের মতো। কারণ হাওয়া যে পরিস্থিতিতে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়।’
২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নরসিংদী সদর উপজেলার ভেলানগর এলাকার হাওয়ার সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নুরজাহানপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। ওই বছরের শেষ দিকে রফিক হাওয়াকে তাঁর বাবার বাড়িতে রেখে দুবাই চলে যান। লেখাপড়ার প্রতি হাওয়ার প্রবল আগ্রহ থাকলেও রফিক চাননি তাঁর স্ত্রী পড়াশোনা করুক। রফিক দুবাই চলে যাওয়ার পর তাঁকে না জানিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যান জুই। লেখাপড়ার প্রতি মেয়ের প্রবল আগ্রহ দেখে বাবা ইউসুফ মিয়া স্বামীকে না জানিয়েই নরসিংদী সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণীর মানবিক বিভাগে জুঁইকে ভর্তি করিয়ে দেন।
কলেজে ভর্তির খবর শুনেই ক্ষিপ্ত হন রফিক। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রফিক দেশে ফেরেন। তাঁর অমতে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার জিয়া কলোনিতে বোনের বাসায় চাপাতি দিয়ে জুঁইয়ের আঙুল কেটে নেন রফিক। পরে পুলিশ রফিককে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনায় জুঁইয়ের বাবা ইউনুছ মিয়া বাদী হয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজের আদালতে বিচারাধীন। রফিক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

আমরা জুইয়ের মত মেয়েদের নিয়ে গর্বিত।পড়ালেখার প্রতি তাদের অদম্য আগ্রহ যে কোনো কিছুর কাছে হার মানতে বাধ্য।