আজ অনেকদিন পরে ব্লগ লিখতে বসলাম।খুব মজার একটি বিষয় মিষ্টি নিয়ে আজ লিখব।কেমন হল তা কমেন্ট করে জানাবেন।

ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন মিষ্টি মতিচূরের লাড্ডু। বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। আধুনিক সন্দেশ-রসগোল্লার বয়স মাত্র দুই-আড়াই’শ বছর। বাঙালিরা ছানা তৈরি করতে শিখেছে পর্তুগিজদের থেকে। তাদের কাছ থেকে বাঙালি ময়রারা ছানা ও পনির তৈরির কৌশল শেখে। ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দরে এসেছিলেন ১৪৯৮ সালে, ভারত ত্যাগ করেন ১৫০৩ সালে। উপমহাদেশে ছানা তৈরির শিক্ষাবিস্তার অনেক পরের ঘটনা।
প্রথম দিকে ছানা ও ছানার মিষ্টি একরকম পরিত্যাজ্যই ছিল ধর্মীয় কারনে। বৈদিক যুগে দুধ ও দুধ থেকে তৈরি ঘি, দধি, মাখন ইত্যাদি ছিল দেবখাদ্য। বিশেষ করে ননি ও মাখন অত্যন্ত প্রিয় ছিল শ্রীকৃষ্ণের। এ জন্য দুধ থেকে রূপান্তরিত ওই সব খাদ্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু ছানা তৈরি হয় দুধ বিকৃত করে, এ জন্য মনুর বিধানমতে, ছানা ছিল অখাদ্য।
এ সম্পর্কে সুকুমার সেন তাঁর কলিকাতার কাহিনী বইয়ে লিখেছেন, “ক্ষীর-মাখন-ঘি-দই—এগুলো কাঁচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম, কৃত্রিম অথবা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনোটিই দুধের বিকৃতি নয়। ‘ছানা’ কিন্তু ফোটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি। বাঙালি অন্য দ্রব্য সংযোগ করে দুধ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, যাতে সারবস্তু ও জলীয় অংশ পৃথক হয়ে যায়। এভাবে দুধ ছিন্নভিন্ন করা হয় বলেই এর নাম হয়েছিল বাংলায় ‘ছেনা’, এখন বলা হয় ‘ছানা’ . সংস্কৃত ভাষায় ছানার কোনো রকম উল্লেখ নেই। অন্য ভাষাতেও ছিল না। আগে অজ্ঞাত ছিল বলেই শাস্ত্রসম্মত দেবপূজায় ছানা দেওয়ার বিধান নেই।”
সন্দেশ ছানা আবিষ্কারের আগে ছিল। আগের দিনে সন্দেশ তৈরি করা হতো বেসন, নারকেল ও মুগের ডালের সঙ্গে চিনির সংযোগে। এ ছাড়া শুধু চিনি দিয়ে তৈরি এক ধরনের চাকতিকেও অনেক সময় সন্দেশ বলা হতো। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস বইয়ে বাঙালির মিষ্টিজাতীয় যে খাদ্যের বিবরণ দিয়েছেন, তাতে সংগত কারণেই ছানার কোনো মিষ্টির উল্লেখ নেই। দুধ থেকে তৈরি মিষ্টির মধ্যে আছে দই, পায়েস ও ক্ষীরের কথা। সন্দেশের উল্লেখ আছে, তবে সেই সন্দেশ ছানার নয়। তিনি বলেছেন, ‘কোজাগর পূর্ণিমা রাত্রে আত্মীয়-বান্ধবদের চিপিটক বা চিঁড়া এবং নারিকেলের প্রস্তুত নানা প্রকারের সন্দেশ পরিতৃপ্ত করিতে হইত এবং সমস্ত রাত বিনিদ্র কাটিত পাশা খেলায়।’
চিনির সঙ্গে ছানার রসায়নে আধুনিক সন্দেশ ও রসগোল্লার উদ্ভাবন অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে। এই আধুনিক সন্দেশ রসগোল্লার আবিষ্কর্তা হুগলির হালুইকররা। পরে তারা কলকতায় এসে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একে জগদ্বিখ্যাত করে তোলেন। প্রথম দিকে ছানার সন্দেশকে বলা হতো ‘ফিকে সন্দেশ’.কারণ, এ সন্দেশে আগের দিনের সন্দেশের চেয়ে মিষ্টি কম। শাস্ত্রসম্মত নয় বলে ছানার সন্দেশ অনেকে খেতে চাইত না। কলকাতার ময়রাদের সৃষ্টিতে মুগ্ধ শংকর তাঁর বাঙালির খাওয়া দাওয়া বইয়ে কড়াপাক, নরমপাক, কাঁচাগোল্লা, চন্দন সন্দেশসহ হাজার রকম সন্দেশের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এঁরা আমেরিকান বিজ্ঞানীদের মতো পাইকিরি হারে মিষ্টি শাস্ত্রে নোবেল জয়ী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।’ তিনি জানিয়েছেন, সন্দেশ এত বৈচিত্র্যময় যে শীতকালের সন্দেশ আর গ্রীষ্মের সন্দেশে তো পার্থক্য আছেই, এমনকি সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরের সন্দেশও নাকি এক রকম নয়।


রসগোল্লার নাম আদিতে ছিল গোপাল গোল্লা। রসের রসিক বাঙালি চিনির সিরায় ডোবানো বিশুদ্ধ ছানার গোল্লাকে নাম দিয়েছে রসগোল্লা। পরে ছানা ও চিনির রসায়নে নানা আকৃতি ও স্বাদে নানা নামে মিষ্টির সম্ভার হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে আছে লেডিকেনি, চমচম, পানিতোয়া, কালোজাম, আমৃতি, রসমালাই—হরেক রকম। রসগোল্লার মতোই গোলাকার লাল রঙের লেডিকেনি নামে মিষ্টিটি তৈরি হয়েছিল ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রীর সম্মানে। লোকমুখে এর চলতি নাম লেডিকেনি। আর রসগোল্লার সর্বশেষ নিরীক্ষাধর্মী সংস্করণ হলো স্পঞ্জ রসগোল্লা। এর উদ্ভাবক কলকাতার বাগবাজারের নবীন ময়রা। এটি এখন উভয় বাংলায় বেশ জনপ্রিয়। ছানার মিষ্টি এপার-ওপার উভয় বাংলায় বিপুল জনপ্রিয় হলেও বঙ্গের বাইরে, বিশেষত ভারতের অন্যত্র এখনো ছানার মিষ্টি তেমন তৈরি হয় না। বহির্বঙ্গের মিষ্টি প্যাড়া, মেওয়ার শুকনো মিষ্টি। এ কারণেই দিল্লির মসনদ এখনো লাড্ডুর দখলে।

বাংলাদেশের দেশের বিখ্যাত মিষ্টি
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ মিষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন সেখানকার ময়রারা। তাঁদের নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতায় ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠেছে সেসব মিষ্টি। এর মধ্যে আছে,

  • টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম,
  • নাটোরের কাঁচাগোল্লা,
  • কুমিল্লার রসমালাই,
  • বিক্রমপুর ও কলাপাড়ার রসগোল্লা,
  • বগুড়া (মূলত শেরপুর) ও গৌরনদীর দই,
  • যশোরের খেজুরগুড়ের সন্দেশ,
  • শাহজাদপুরের রাঘবসাই,
  • মুক্তাগাছার মণ্ডা,
  • খুলনা ও মুন্সিগঞ্জের আমৃতি
  • কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি
  • নওগাঁর প্যারা সন্দেশ
  • ময়মনসিংহের আমিরতি
  • যশোরের জামতলার মিষ্টি, খেজুরের নোলন গুড়ের প্যারা সন্দেশ,খেজুর রসের ভিজা পিঠা
  • মাদারীপুরের রসগোল্লাতো
  • রাজশাহীর তিলের খাজা
  • সিরাজদিখানের পাতক্ষীরা
  • রাজবাড়ির শংকরের ক্ষীরের চমচম
  • নওগাঁর রসমালাই
  • পাবনার প্যারাডাইসের প্যারা সন্দেশ, শ্যামলের দই
  • সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পানিতোয়া
  • কুষ্টিয়ায় মহিষের দুধের দই।
  • মেহেরপুরের সাবিত্রী নামে একটা মিষ্টান্ন
  • কুষ্টিয়ার তিলের খাজা
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখি!
  • মানিকপুর– চকরিয়ার মহিষের দই,ইকবালের সন্দেশ(দেওয়ান বাজার),বোম্বাইয়াওয়ালার ক্ষীর(এনায়েত বাজার)
  • মহাস্থানের কটকটি
  • গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি
  • কুষ্টিয়ার স্পেশাল চমচম
  • ঢাকার বংগবন্ধু আভিনিউ এর পূর্ণিমার জিলাপী
  • গুলশান এর সমরখন্দ এর রেশমী জিলাপী
  • মহেশখালীর মোষের দই
  • রাজশাহীর রসকদম
  • শিবগঞ্জের (চাঁপাই নবাবগঞ্জ) চমচম, প‌্যারা সন্দেশ।
  • কিশোরগঞ্জের তালরসের পিঠা ( চিনির শিরায় ভেজানো)

মিষ্টি নির্মাতা, মিষ্টির দোকান
মিষ্টি নির্মাণ একটি বিশেষ কলা। যারা মিষ্টি তৈরী করে তাদের বলা হয় ময়রা।
এলাকাভিত্তিক মিষ্টির প্রসিদ্ধি ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবেও অনেক মিষ্টিশিল্পী খ্যাতিমান হয়েছেন বিশেষ কোনো মিষ্টি তৈরির জন্য। এ ছাড়া ঢাকার পুরোনো খ্যাতিমান মিষ্টির দোকানের মধ্যে আছে,

  • আলাউদ্দিন সুইটস ও
  • মরণ চাঁদ।
  • বনফুল,
  • মুসলিম সুইটস,
  • রস
  • আম্বালাসহ
  • সালাম।

এই হল মিষ্টির ইতিহাস।আশা করি এরপর থেকে মিষ্টি খাওয়ার সময় মনে করবেন কোন এলাকার/অঞ্চলের মিষ্টি খাচ্ছে। 🙂

সবাইকে কষ্ট করে পোস্টটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।